ভোট কেনার অভিযোগে জাপানের আইনপ্রণেতা স্বামী-স্ত্রী গ্রেপ্তার

জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী কাৎসুইয়ুকি কাওয়াই। ছবি: রয়টার্সজাপানের নির্বাচন আইন ও নির্বাচনসংক্রান্ত বিধিমালা খুবই কঠোর। বিশেষ করে নির্বাচনে প্রার্থীদের অর্থ খরচ করার ওপর রয়েছে নানা রকম বিধিনিষেধ। অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনা বন্ধের এই উদ্যোগ জাপানে নেওয়া হয় ১৯৯৪ সালে। এর আগে ভোট গ্রহণকে সামনে রেখে টাকাপয়সার হাতবদল এতটাই প্রবল ও দৃষ্টিকটু হয়ে উঠেছিল যে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও মানুষ তাঁদের ওপর আস্থা রাখতে পারছিলেন না। সেই অবস্থা থেকে দেশকে বের করে আনার লক্ষ্যে চালানো বেশ কিছু সংস্কারের মধ্যে অন্যতম ছিল এই নির্বাচনী আইনের সংশোধন। ফলে টাকা দিয়ে ভোট কেনা জাপানে এখন তেমন সহজ কিছু নয়, এমনকি সে রকম পথে ভোটে জিতে গেলেও বিজয়ী প্রার্থীদের এর মাশুল ঠিকই দিতে হয়।

ঠিক সে রকম এক বাস্তবতার মুখে এখন পড়েছেন জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী কাৎসুইয়ুকি কাওয়াই এবং তাঁর স্ত্রী আনরি কাওয়াই। দুজনেই তাঁরা সংসদের নির্বাচিত সদস্য, স্বামী নিম্নকক্ষের এবং স্ত্রী উচ্চকক্ষের। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে ২০১৯ সালের উচ্চকক্ষ নির্বাচনের সময় অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনায় তাঁরা জড়িত ছিলেন এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে হাতে অনেক প্রমাণপত্র আসার পর আজ স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই গ্রেপ্তার করেছেন কৌঁসুলিরা। জাপানের আইনে সংসদের অধিবেশন চলাকালে সাংসদদের গ্রেপ্তারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি আছে। ফলে সংসদের অধিবেশন মুলতবি হওয়ার অপেক্ষায় কৌঁসুলিদের থাকতে হয়েছে এবং ১৭ জুন অধিবেশন মুলতবি হয়ে গেলে দুজনকেই শ্রীঘরে নিয়ে যাওয়া হয়।

এই দম্পতি অবশ্যই হচ্ছেন জাপানের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের দলে অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে ৫৭ বছর বয়সী কাৎসুইয়ুকি ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে মন্ত্রিসভা পর্যন্ত উঠে যেতে পেরেছিলেন এবং নিজের সব রকম যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে স্ত্রীকেও তিনি তুলে এনেছিলেন এলিট রাজনীতিকদের পর্যায়ে। তবে জাপানের বিচার বিভাগ, বিশেষত জনকৌঁসুলি দপ্তরের স্বাধীনতার কারণেই শেষ রক্ষা তাঁদের হয়নি।

যে পরিমাণ অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে, তা কিন্তু তেমন বেশি কিছু নয়। বলা হচ্ছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনে হিরোশিমা জেলার একটি আসন থেকে প্রার্থী হওয়া স্ত্রী আনরির জয় নিশ্চিত করে নিতে স্বামী-স্ত্রী মিলে ২ লাখ ৪৩ হাজার মার্কিন ডলার ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। সেই অর্থ তাঁরা দিয়েছিলেন জেলা ও নগর পরিষদের প্রায় ১০০ সদস্য ও অন্যদের। শর্ত ছিল, ভোট পাইয়ে দিতে তাঁরা সাহায্য করবেন। তাঁরা দুজনই অবশ্য জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তবে কৌঁসুলিদের চালানো ব্যাপক তল্লাশিতে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং এমনকি ক্ষমতাসীন দলও এখন আর তাঁদের দায়দায়িত্ব নিতে চাইছে না। যদিও সাতবারের নির্বাচিত সাংসদ কাৎসুইয়ুকি কাওয়াইকে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের কাছের মানুষ হিসেবে দেখা হয়। প্রতিকূল অবস্থায় দলের ভেতর থেকে আসা চাপের মুখে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই এখন দল ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী কাৎসুইয়ুকি কাওয়াইয়ের স্ত্রী আনরি কাওয়াই। ছবি: রয়টার্স২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাৎসুইয়ুকি কাওয়াই আবে মন্ত্রিসভায় বিচারমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তবে এর অল্প কিছুদিন পর স্ত্রীর নির্বাচনী প্রচারে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি বেতন দিয়ে প্রচারকর্মী নিয়োগের অভিযোগ ওঠায় দায়িত্ব গ্রহণের মাসখানেকের মধ্যে সেই পদ তাঁকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। এরপর থেকে কৌঁসুলিরা অভিযোগ আরও তলিয়ে দেখতে শুরু করলে নগদ অর্থ লেনদেনের বিষয়টি উঠে আসে এবং জাপানের সংবাদমাধ্যমও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও অনেক কিছু প্রকাশ করে দেয়।

প্রার্থীদের জন্য তুলনামূলক সম-অবস্থান তৈরি করে দিতে জাপানে নির্বাচনী প্রচারে অর্থ খরচের কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা আছে। প্রার্থীরা চাইলেই সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারেন না, এমনকি নিজেরা তাঁর পোস্টারও ছাপাতে পারেন না। নির্বাচনী পোস্টার রাষ্ট্রের খরচে ছেপে দেওয়া হয় এবং পোস্টারের সংখ্যাও থাকে সবার জন্য একই রকম। এ ছাড়া ভোট গ্রহণ শেষ হয়ে যাওয়ার পর খরচাপাতির পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব সব প্রার্থীকে দাখিল করতে হয়।

জাপানের নির্বাচনী আইনের এই সব দিক থেকে মনে হয় অনেক কিছু শেখার রয়ে গেছে, যেমন শেখার আছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে নেওয়ার দিকগুলো থেকেও। জাপানের কৌঁসুলিদের দপ্তরকে বলা হয় জনকৌঁসুলির দপ্তর, সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর নয়। প্রশাসনিক বিভাগ থেকে এর স্বাধীন অস্তিত্ব নিশ্চিত করে নিতেই এই ব্যবস্থা। ফলে কৌঁসুলিরা অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পান, আইনপ্রণেতা স্বামী-স্ত্রীর গ্রেপ্তার হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাটিও যার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

amaderdinkal.com

ডেস্ক রিপোর্ট

%d bloggers like this: