বৃত্ত

করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ-বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: dp@prothomalo.com

ইদানীং টেলিভিশন দেখি না, খবরও দেখি না। যদিও বাসায় প্রথম আলো নেই প্রতিদিন, তা–ও খবরগুলো খুব বেশি খুঁটিয়ে পড়া হয় না। কিন্তু একবার চোখ না বোলালেও ভালো লাগে না। বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে শুধুই করোনা, পত্রপত্রিকায় শুধুই করোনা, ফেসবুক সেখানেও করোনা। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃতের হিসাব নেওয়া যেন একটা রুটিন কাজ।

আমার বড় ছেলে, বয়স ৮, জিজ্ঞেস করে, আব্বু আজ কতজন আক্রান্ত হলো, কতজন সুস্থ হলো, কতজন মারা গেল? আমার ছোট ছেলে, বয়স ৪ বছর। সে করোনার কিছু না বুঝলেও এখন বাসা থেকে বের হতেই মাস্ক, গ্লাভস পরতে হয়, বাইরে থেকে এলে হাত ধুতে হয় এটা বুঝে গেছে।

করোনা শরীরে এখনো আক্রান্ত করতে না পারলেও মনকে আক্রান্ত করেছে অনেক আগেই। প্রতিনিয়তই এর থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজি, কিন্তু পারি না। কিছুদিন ফেসবুক ব্যবহারও বন্ধ রেখেছিলাম, তা–ও পারিনি। কারণ, ফেসবুকই এখন স্বজন, বন্ধুবান্ধবের ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেওয়ার জায়গা হয়েছে। এর থেকে দূরে থাকতে গেলেই আমি যেন সমাজ থেকেই দূরে চলে যাই। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই গোসল সেরে নাশতা করে অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি, আগে ঘর থেকে বের হবার সময় চেক করতাম মানিব্যাগ, মোবাইল, ঘড়ি সঙ্গে নিলাম কি না? এখন এর যুক্ত হয়েছে মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, স্যানিটাইজার নিলাম কি না? সকাল হতেই করোনার প্রস্তুতি। অনেক কায়দা করে রাস্তায় সামাজিক দূরত্ব মাপতে মাপতে ট্যাক্সিতে উঠেই চিন্তা করতে থাকি আমার আগে যে প্যাসেঞ্জার বসেছিল, তার কি করোনা ছিল, ট্যাক্সির সিট, দরজা এসব কি জীবাণুমুক্ত? চালক সুস্থ তো? এসব ভাবতে ভাবতে ট্যাক্সির জানালা দিয়ে বাইরে মানুষগুলোর দিকে দেখি। সবার মুখে মাস্ক, কেউ আবার বড় বড় গগলস পরে আছেন, কেউ ফেসশিল্ড পরে আছেন, কেউ আবার পিপিই পরে আতঙ্কিত চেহারা করে নিজ নিজ গন্তব্যে যাচ্ছেন।
আবার কেউ কেউ ভাবলেশহীনভাবেই ঘোরাঘুরি করছে, সুরক্ষার কোনো বালাই নেই, দেখে হিংসেই হয়। অফিসে পৌঁছালেই থার্মাল মেশিনে তাপমাত্রা মাপতে লাগলেই বুক ধক করে ওঠে যদি তাপমাত্রা বেশি পাওয়া যায়, কী যে হবে? জিজ্ঞেস করি, কত? সিকিউরিটি গার্ড হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলে, স্যার ৯৭.৫। মনে মনে আত্মতৃপ্তিতে ভুগি। আহ্‌! অফিসে কাজের ফাঁকে ফাঁকেই আলোচনা, বিষয়বস্তু করোনা।
ব্যাংকের চাকরি, বিভিন্ন রকম কাস্টমার ডিলিংস, তাই সুরক্ষা ব্যবস্থাও সর্বোচ্চ, তারপরও আতঙ্কের শেষ নেই। ব্যবসায়ী গ্রাহকদের দুরবস্থার কথা শুনতে শুনতে আরও আতঙ্কা পেয়ে বসে, কীভাবে ঠিক হবে দেশের অর্থনীতি? কিছু ছোট ব্যবসায়ী যাঁরা হয়তো ক্ষতি পুষিয়ে উঠতেই পারবেন না, করোনার পরে তাঁদের জীবনগাথা কেমন হবে? ইদানীং কিছু গ্রাহক তাঁদের সঞ্চয়গুলো ভাঙাতে আসেন, জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানান কারও বেতন বন্ধ, কারও চাকরি নেই, কারও ব্যবসা বন্ধ। তাই না পারতে শেষ সঞ্চয়টুকু ভাঙাতে এসেছেন। তাঁদের সবার চোখেমুখেও করোনার থাবা।

করোনার কারণে আব্বা-আম্মার সঙ্গে দেখা হয় না প্রায় ৪ মাস। ভাবতেই কষ্ট হয়, মাঝে মাঝে কান্না চেপে রাখি। যেখানে প্রতি মাসে দু-একবার যাওয়া হতো সেখানে প্রায় ৪ মাস! মাঝখানে ঈদ করলাম নিরানন্দহীনভাবে তাঁদের বাদেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য—সবাই যাতে সুস্থ থাকি। তা–ও তাঁদের নিয়েও চিন্তার অন্ত নেই, দুজনই বার্ধক্য রোগে আক্রান্ত, সঙ্গে আম্মার অ্যাজমার সমস্যা আর আব্বা স্ট্রোকের রোগী। ফোনে যখন কথা হয়, আমি বুঝি তাঁদের মন কাঁদে, তা–ও বলে ভালো থাকো। আমিও মনে মনে বলি, তাঁরাও ভালো থাকুন।
আমার স্ত্রীও ব্যাংকার। তার কাহিনি আর আমার কাহিনি একই। তবে তাকে দেখে মনে হয় ইদানীং ও একটু বেশিই ডিপ্রেসড। আমি জীবনের একঘেয়েমি থেকে বাঁচতে, দু-একটি দৈনিক পত্রিকায় মাঝেমধ্যে নিবন্ধ লিখি, বেশির ভাগ ব্যাংকিং নিয়ে। করোনা লকডাউনের শুরুতে আমিও সবার মতো স্রোতে গা ভাসিয়ে করোনা নিয়ে দু-তিনটি লেখা লিখেছিলাম। তাতেইও বিরক্ত। বলে, তুমি কি আর কিছু পাও না? করোনা নিয়েই লিখতে হবে? এর থেকে মুক্তি নাই? আমি মনে মনে বলি, আমিও মুক্তি চাই। আগে শুধু করোনা প্রতিরোধের মানসিকতা নিয়ে চলতাম, এখন প্রতিরোধের সঙ্গে প্রতিকারের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রতিদিন ঘুমাতে যাবার আগে আর ঘুম থেকে ওঠার পর নিজেকে যখন সুস্থ মনে হয়, পুলকিত হই, সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ হই, আরেকটি দিন সুস্থ হিসেবে বোনাস পাওয়ার জন্য। দিন শুরুর আগে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যদি আক্রান্ত হয়েই যাই, আমার থেকে যাতে কেউ আর আক্রান্ত না হয়, আমিই যেন শেষ আক্রান্ত হই।
ইশ্‌! আবার করোনা নিয়ে লিখছি! করোনার বৃত্তের মধ্যেই জীবন ঘুরপাক খাচ্ছে। নাহ্‌, আর না, করোনার বৃত্ত থেকে তো বের হতেই হবে। এবার অন্য কিছু ভাবি।
* প্রিন্সিপাল অফিসার, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, সিডিএ অ্যাভিনিউ শাখা, চট্টগ্রাম। ziauddin24@gmail.com

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

amaderdinkal.com

ডেস্ক রিপোর্ট

%d bloggers like this: