তায়েব, ছয়টি মুখ ও বাজেট

 

তায়েব হোসেনদিন কী সুন্দরই না কাটছিল! শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁয় কাজে তেমন কষ্ট নেই। থাকা-খাওয়া বিনা মূল্যে। মাস শেষে তায়েব হোসেন ১০ হাজার টাকা বেতনের ৮ হাজারই বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন।

 

স্কুল ও কলেজপড়ুয়া দুই ভাই, এক বোন ও মা-বাবা নিয়ে তায়েবের ছয় সদস্যের পরিবার। নিজের বেতনের সঙ্গে স্থানীয় বাজারে বাবার কাপড় লন্ড্রি বা ইস্তিরি দোকানের আয়—দুয়ে মিলে সংসারে অভাব ছিল না। কিন্তু গত তিন মাস তায়েব হোসেনের জীবনে অন্ধকার নিয়ে এসেছে।

 

দেশে করোনা ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর গত ২৬ মার্চ থেকে রেস্তোরাঁটি বন্ধ রয়েছে, যেটিতে তায়েব কাজ করতেন। বাবা যে লন্ড্রির দোকানটি চালাতেন, সেটিও এখনো খোলা হয়নি। রেস্তোরাঁ কবে খুলবে; আর লন্ড্রিটিও কবে চালু হবে, ক্রেতা আসবে, তা কেউ জানে না। ইতিমধ্যে সঞ্চয়ের টাকা শেষ। এখন একেকটা দিন যায়, ঘরে চাল বাড়ন্ত (কমা) হতে থাকে, তায়েবের দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে।

 

উত্তরার ওল্ডটাউন রেস্তোরাঁর ১৮ জন কর্মীর ১ জন এই তায়েব হোসেন। বয়স ২৮ বছর। বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলায়। আসলে শুধু ওল্ডটাউন নয়, বাংলাদেশের হাজার হাজার হোটেল–রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানের চিত্র এটি। করোনার ভয়ে উচ্চবিত্তরা এখন রেস্তোরাঁয় খেতে যায় না। মধ্যবিত্তদের মধ্যেও ভয়ের সঙ্গে রয়েছে সামর্থ্যের অভাব। আর নিম্নবিত্তরা বরং ভাতের হোটেলে যায়, তবে সংখ্যায় কমেছে। ব্যয়ও কমিয়েছে।

 

তায়েবের মতো হোটেল–রেস্তোরাঁর লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যাঁদের সিংহভাগই তরুণ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) বরাত দিয়ে বাংলাদেশ হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশন বলছে, দেশে এ খাতে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। তাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এখন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শ্রমিকই বেকার হয়ে আছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, অভিজাত রেস্তোরাঁগুলো এখন প্রায় বন্ধ। বাকিরা কর্মী তিন ভাগের এক ভাগে নামিয়ে এনে কোনোমতো ব্যবসা চালাচ্ছে।

 

শ্রমিকদের বেশির ভাগের অবস্থাই তায়েব হোসেনের মতো। ঢাকায় থাকার সংগতি নেই। তাই গ্রামে ফিরে গেছেন। সেখানে অন্তত মেসভাড়া লাগে না।

 

তায়েবকে ফোন করেছিলাম গতকাল মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। জানতে চাইলাম, কী করছেন? উত্তর দিলেন, ‘ঘুরেফিরে সময় কাটাই। ভালো লাগে না। কিছু টাকা ছিল, শেষ। এমন একটা পরিস্থিতি, সামনে হাত পাতা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু হাত পাততেও তো পারি না।’ বললাম, কাজ করে খেতে তো দোষ নেই। দরকার হলে মাটি কাটবেন? জবাব দিলেন, ‘কার মাটি কাটব? কেউ তো এখন মাটিও কাটাচ্ছে না।’

 

ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস ১৯২৯ সালের মহামন্দা কাটাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারি ব্যয় বিপুলভাবে বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছিলেন। তাঁর পরামর্শ ছিল, দরকার হলে একজনকে টাকা দিয়ে গর্ত খোঁড়াতে হবে, আরেকজনকে টাকা দিয়ে সেই গর্ত আবার ভরাতে হবে। এতে বাজারে টাকা ঘুরবে, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।

 

করোনায় রেস্তোরাঁটি বন্ধ। তাই চাকরি হারিয়েছেন তায়েব। বাজেটও কিছু রাখেনি, উল্টো বাড়িয়েছে খরচ।

 

মন্দা কাটাতে এই কৌশলকে অব্যর্থ মেনে দেশের অর্থনীতিবিদেরা সরকারকে কর্মসৃজন প্রকল্প নিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যাতে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া মানুষগুলো কাজ পায়। অবশ্য এই মন্দাকালে সরকার আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের যে বাজেট দিয়েছে, সেখানেও তায়েবদের মতো নাগরিকদের জন্য তেমন কিছু নেই।

 

কিন্তু তায়েব হোসেনদের ব্যয় বাড়ানোর পদক্ষেপ কিন্তু আছে বাজেটে। কীভাবে? সেটা নাহয় তায়েবের মুখেই শুনুন, ‘চাকরির খোঁজের জন্য চলতি জুন মাসে ৫৯ টাকা করে রিচার্জের মাধ্যমে দুই দফা মিনিট প্যাকেজ কিনেছি। আগে যেখানে ১০০ মিনিট পাওয়া যেত, বাজেটের পর পাওয়া যাচ্ছে ৯০ মিনিট।’

 

মো. তায়েব নামে ফেসবুকে তাঁর একটি অ্যাকাউন্ট আছে। ইন্টারনেট ডেটা কেনার টাকা নেই, তাই এখন আজকাল আর ফেসবুকে ঢোকা হয় না তাঁর। সরকারি হিসাব বলছে, মার্চ ও এপ্রিল দুই মাসে মোবাইলে ইন্টারনেট গ্রাহক কমেছে ২১ লাখ।

 

তায়েবদের হাতে টাকা থাকলে তাঁরা তা দিয়ে চাল-ডাল-তেল-চিনি কিনবেন। পাড়ার দোকান থেকে টাকা যাবে পরিবেশকের কাছে। পরিবেশক দেবেন মেঘনা-সিটি গ্রুপকে। তারা তেল-চিনি আমদানি ঠিক রাখলে ব্যাংকের আয় কমবে না। ব্যাংকের আয় না কমলে কর্মীদের বেতন কমবে না। কর্মীদের বেতন না কমলে ওয়ালটনের রেফ্রিজারেটর বিক্রি ঠিক থাকবে। প্রতিটি লেনদেনে সরকার রাজস্ব পাবে—এটাই তো অর্থনীতির নিয়ম।

 

টাকা এভাবে ঘুরে ঘুরে অর্থনীতিকে সচল রাখে। বদৌলতে জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) বাড়তে থাকে। কিন্তু যদি টাকাই না থাকে, তাহলে মানুষ ব্যয় করবে কোথা থেকে, কিংবা টাকা ঘুরবেই–বা কীভাবে?

 

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বাজেটে কাজ হারানো এই তরুণদের বিষয়ে সমাধান কী কী আছে? তিনি বললেন, তাঁর মনে হয়, এই সমস্যা স্বীকারই করা হয়নি। জনাব রায়হানের পরামর্শ, দ্রুত কর্মসৃজন প্রকল্প নেওয়া হোক। কাজ না পেলে তরুণদের একাংশ কিছুদিন পরেই বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।

 

এই সমস্যা কি সরকারের নজরে কেউ এনেছিল, তা জানতে ফোন করলাম বাংলাদেশ হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. আবদুল খালেককে। তিনি জানালেন, নিজেই চাকরি হারিয়ে এখন গ্রামের বাড়ির (নাটোরের বড়াইগ্রামে) কাছে চায়ের দোকান দিয়ে বসেছেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ক্যানটিনে বাবুর্চির কাজে মাসে বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা। এখন দিনে শ দেড়েক টাকা আয় হয়। তাঁর ছেলেও একটি হোটেলে কাজ করত। এখন সে–ও বেকার।

 

আবদুল খালেক জানালেন, শ্রমিকদের জন্য রেশন চেয়ে তাঁরা ঢাকা জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়েছেন। কোনো কাজ হয়নি। তিনি বলেন, ‘সরকার নাকি ৭৬০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। আমি তো অনেকের সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। তারা কেউ তো পায়নি, আশপাশে কেউ পেয়েছে বলেও শোনেনি। তাহলে পেল কারা?

 

Spread the love
  • 3.9K
  • 2.2K
  • 2.1K
  • 2K
  •  
  •  
  •  
    10.3K
    Shares

amaderdinkal.com

ডেস্ক রিপোর্ট

%d bloggers like this: