কাফকার রসিকতা

ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস আমেরিকান উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও প্রাবন্ধিক। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপকও ছিলেন তিনি । ‘ইনফাইনেট জেস্ট’ উপন্যাসের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। কাফকার ‘দ্য ক্যাসল’ বইটি নতুন করে অনুবাদ করার পরে; নিউইয়র্কের পেন আমেরিকান সেন্টারে ‘মেটামরফোসিস: আ নিউ কাফকা’ নামে একটি অনুষ্ঠানে ওয়ালেস এই বক্তব্যটি রেখেছিলেন। পরে তা তাঁর নন-ফিকশনের বই ‘কনসিডার দ্য লবস্টার’-এ ‘সাম রিমার্কস অন কাফকা’স ফানিনেস ফ্রম উইস প্রবাবলি নট এনাফ হ্যাজ বিন রিমুভড’ নামে প্রকাশিত হয়। আজকের দিনে মারা গেছেন কাফকা মৃত্যুবরণ করেছেন আজকের এই দিনে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আমাদের এই ছোট আয়োজন। প্রবন্ধটি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন কে এম রাকিব।

ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসএ বিষয়ে বলার একদম যোগ্য না হয়েও সবার উদ্দেশে কিছু কথা বলতে চাওয়ার একটা কারণ হলো, এই বক্তৃতা আপনাদের সামনে কাফকার একটা গল্প পাঠের সুযোগ করে দিচ্ছে। গল্পটা একসময় আমি সাহিত্যের ক্লাসে পড়াতাম। সেই পাঠ করাটা আমি মিস করি। গল্পের ইংরেজি শিরোনাম ‘আ লিটল ফেবল’:

‘ইঁদুরটা বলল, হায়! পৃথিবীটা দিনকে দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে। শুরুতে পৃথিবী এত বড় ছিল যে আমি ভয় পেতাম, আমি ছুটতাম আর ছুটতাম; ডানে ও বাঁয়ে বহুদূরের দেয়ালগুলো দেখে ভালো লাগত। কিন্তু ইদানীং দেয়ালগুলো এত দ্রুত সংকুচিত হয়ে গেছে যে আমি অন্তিম ঘরটাতে চলে এসেছি। ঘরের এক কোণে ফাঁদ পাতা আছে, যা আমাকে পেরিয়ে যেতেই হবে। “তোমার শুধু দরকার দিকটা বদলানো”—বলে বিড়াল ইঁদুরটাকে খেয়ে ফেলল। ‘

আমার ক্ষেত্রে, কলেজ শিক্ষার্থীদের সামনে কাফকা পাঠে হতাশার ব্যাপার হলো: শিক্ষার্থীদের বোঝানো মোটামুটি অসম্ভব যে কাফকার রচনা মজার। এবং কাফকার গল্পের শক্তিমত্তা এই ফানিনেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

উভয়েই অনেকাংশে নির্ভর করে—কমিউনিকেশন তাত্ত্বিকরা যাকে বলেন—’এক্সফরমেশন’-এর ওপর; যে ক্ষেত্রে এমন কিছু দরকারি তথ্য, যা গল্প থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, গল্পের বয়ান ও অবয়বের সাহায্যে সেটির বোধ জাগিয়ে তোলা হয়, ফলে প্রাপকের (‘রিসিপিয়েন্ট’, এ ক্ষেত্রে পাঠক) মনে একধরনের ব্যাঞ্জনাগত বিস্ফোরণ (অ্যাসোসিয়েটিভ এক্সপ্লোশন) ঘটে। এ কারণেই হয়তো প্রায়ই ভালো কৌতুক ও ছোটগল্পের পাঠ পাঠকের মনে ধাক্কার মতো একই ধরনের আকস্মিক উপলব্ধির বোধ আনে।

অকারণে তো আর কাফকা সাহিত্যকে ‘আমাদের অন্তর্গত জমাট বরফকে ভাঙার কুঠার’ বলেননি। আর স্বভাবতই অসাধারণ গল্পের সফলতা হিসেবে সংকোচন বা অল্প কথায় অনেক কিছু প্রকাশের ক্ষমতাকে ধরা হয়, যেখানে চাপ ও রিলিফ পাঠকের ওপর ক্রিয়া করে। কাফকা অন্যদের থেকে যা ভালো করতেন তা হলো, চাপটা এমনভাবে এমন বেশিমাত্রায় হাজির করা যে রিলিজের পূর্বমুহূর্তে তা অসহনীয় হয়ে ওঠে।

কৌতুকের মনস্তত্ত্ব কাফকা পড়ানোর সমস্যা বুঝতে সাহায্য করে। আমরা সবাই জানি, কৌতুকের অদ্ভুত ম্যাজিক নষ্ট করার সবচেয়ে ভালো উপায় কৌতুকটা ব্যাখা করা। যেমন দেখিয়ে দেওয়া যে লু কোস্টেলো নামবাচক বিশেষ্য Who-কে প্রশ্নবোধক who মনে করেছে। এ ধরনের ব্যাখ্যা যে বিরক্তির উদ্রেক করে, তা কারও অজানা নয়, যতটা একঘেয়েমি, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর, যেন কোনো ধর্মীয় অবমাননা।

প্লট থেকে চার্ট, প্রতীক থেকে উন্মোচন, মূলভাব ধাপে ধাপে বুঝতে চেষ্টা করার যে আন্ডার-গ্রাজুয়েট ক্রিটিক্যাল বিশ্লেষণের ক্লাসে কাফকা পড়ানো শিক্ষকের অনুভুতিও অনেকটা এমন।

অবশ্য, কাফকা তাঁর ছোটগল্পকে এ ধরনের উচ্চক্ষমতার ক্রিটিক্যাল মেশিনে দেখার যে বিদ্রূপ, তার নিশ্চয়ই তারিফ করতেন, যেহেতু এটা অনেকটা গোলাপ ফুল চমৎকার কেন, তা পাপড়ি ছিঁড়ে, গুঁড়ো করে, স্পেক্টোমিটারে দিয়ে ব্যাখ্যা করার মতো। ফ্রানৎস কাফকা মূলত এমন গল্পকার, যার ‘পসাইডন’ (গ্রিক মিথলজি অনুযায়ী সমুদ্র ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের দেবতা-অনুবাদক) প্রশাসনিক পেপারওয়ার্ক করতে করতে এতই পর্যুদস্ত যে সমুদ্রযাত্রা বা সাঁতারের সুযোগই পায় না, যার ‘পেনাল কলোনিতে’ শাস্তি আর নির্যাতন হলো নীতিশিক্ষা এবং সমালোচনা হলো কপালে সুচালো অস্ত্রের মতো চরম আঘাত।

ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসের বই `কনসিডার দ্য লবস্টার`আরেকটা ঝামেলা হলো এমনকি মেধাবী ছাত্রদের জন্যও, কাফকার রচনা যে এক্সফরমেটিভ ব্যঞ্জনা তৈরি করে ভাষা বা ইতিহাসকেন্দ্রিক নয়, কাফকার ভাব বরং অনেকটা অবচেতন, শিশুদের প্রিমর্ডিয়াল, মিথ থেকে আগত অন্ধ অনুভবের মতো; এ কারণে উদ্ভট গল্পগুলোকেও আমরা পরাবাস্তব না বলে দুঃস্বপ্নের মতো ভেবে থাকি। কাফকায় এক্সফরমেটিভ অ্যাসোসিয়েশন একই সঙ্গে খুব সহজ এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ, প্রায়ই যা নিয়ে ক্রিটিক্যাল আলোচনা করা কঠিন: ভাবুন তো, উদাহরণস্বরূপ, একজন শিক্ষার্থীকে বললেন ইঁদুর, পৃথিবী, দৌড়, দেয়াল, চেম্বার, ফাঁদ, বিড়াল, এবং বিড়ালের ইঁদুর খেয়ে ফেলা ইত্যাদির বৈচিত্র্যময় সম্পর্কের তাৎপর্য তুলে ধরো।

তদুপরি যে বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক আমোদ কাফকা কাজে লাগান, তা অল্পবয়সী আমেরিকান পাঠকদের কাছে গভীরভাবে অপরিচিত। কাফকার হিউমারে সমকালীন আমেরিকান আমোদ-প্রমোদের ফর্ম ও সংকেত কিছুই নেই। বারবার হাজির হওয়া শব্দের খেলাধুলা বা বাগ্ভঙ্গির চমকপ্রদ নৈপুণ্য, চতুর বাক্য বলা বা তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রূপের উপস্থিতিও নেই বললেই চলে। শারীরিক ক্রিয়াকাণ্ডঘটিত হাস্যরসও কাফকাতে নেই, নেই যৌন-ইশারামূলক দ্ব্যর্থকতা। নেই প্রথাবিরোধিতার কোনো ফ্যাশন দুরস্ত প্রচেষ্টা। নেই কলা ছিলানোর পিঞ্চনীয় স্ল্যাপস্টিক বা নিষ্ঠুর সহিংস হাস্যরস; ফিলিপ রথের অনিয়ন্ত্রিত লৈঙ্গিক উত্থান বা জন বার্থের মেটাপ্যারডি বা উডি অ্যালেন-ধর্মীয় অস্তিত্বের অসন্তোষ কাফকায় নেই।

মডার্ন সিটকমের ধুমধাড়াক্কা হিতে বিপরীত হয়ে যাওয়া, অতিসতর্ক অকালপক্ক শিশু বা মুখ খারাপ করা দাদু, দ্রোহী, সিনিক সহকর্মী এসব কোনো অনুসঙ্গই কাফকায় নেই। সম্ভবত সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কাফকার অথরিটি ফিগারগুলো কখনোই বিদ্রূপের যোগ্য স্থূলবুদ্ধির বেকুব নয়, বরং ‘পেনাল কলোনি’র লেফটেন্যান্টের মতো এরা একই সঙ্গে অ্যাবসার্ড, ভীতিজাগানিয়া আর বিষণ্ন।

আমি বলছি না, কাফকার বুদ্ধির দীপ্তি এত সূক্ষ্ম যে দেশের শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে না। আসলে, কাফকার হাস্যরস বোঝার কিছুটা কার্যকর এক কৌশল আমি বের করেছি। শিক্ষার্থীদের আমি বলি যে কাফকার হাস্যরস মূলত বেশ স্থূল, মোটেই সূক্ষ্ম নয়, সূক্ষ্মতাবিরোধী। দাবিটা হলো, কাফকার মজাটা নির্ভর করে যাকে আমরা রূপক বলে ধরে নিই, সেই রূপককে আক্ষরিক অর্থে পাঠ করায়। তাদের বলি, আমাদের কিছু সামষ্টিক অনুভবকে ‘ফিগার অব স্পিচ’-এর মাধ্যমেই কেবল প্রকাশ করা সম্ভব, এ কারণে এই বক্তব্যগুলোকে আমরা বলি অভিপ্রকাশ। ফলে ‘মেটামরফোসিস’-এর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই, আমি শিক্ষার্থীদেরকে ঘিনঘিনে বা নোংরা এমন কোনো লোকের কথা ভাবতে বলি, চাকরিসূত্রেই যাকে মল ঘাঁটতে হয়৷

অথবা বলি জিভ চু চু করে উপহাস করা কিংবা ‘বয়স চল্লিশ হলেই প্রত্যেকের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে’ ধরনের কথার আলোকে ‘পেনাল কলোনি’ পুনর্পাঠ করতে। ‘ক্ষুধাশিল্পী’ পড়া যায় অন্যের মনোযোগ পাওয়ার ক্ষুধা, প্রেম-ক্ষুধায় কাতর, এমনকি এই তুচ্ছ তথ্যের আলোকেও পড়তে বলি যে anorexia (ক্ষুধামান্দ্য) শব্দটার উৎস যে গ্রিক শব্দটি থেকে, তার অর্থ তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা ক্ষুধা।

কাফকার হাস্যরস মূলত বেশ স্থূল, মোটেই সূক্ষ্ম নয়, সূক্ষ্মতাবিরোধী। দাবিটা হলো, কাফকার মজাটা নির্ভর করে যাকে আমরা রূপক বলে ধরে নিই, সেই রূপককে আক্ষরিক অর্থে পাঠ করায়।

শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ মোটামুটি এই পর্যন্ত যায়, তা-ও কম নয়৷ কিন্তু শিক্ষক তবু অপরাধবোধ নিয়ে লিখতে থাকে, কারণ, ‘রূপককে-আক্ষরিক-অর্থে-পাঠ-করার-কমেডি’ হিসেবে দেখার এই কৌশল কাফকার কমেডি যে আসলে ট্র্যাজেডিও, সেই গভীর আলকেমি তুলে ধরতে পারে না; এই ট্র্যাজেডি আবার গভীর আনন্দেরও। [অনুবাদকের নোট: ‘অসম্ভব বেদনার সাথে মিশে রয়ে গেছে অমোঘ আমোদ’—জীবনানন্দ] এর পরে সাধারণত আসে সেই কঠিন সময়, যখন আমি নানা যুক্তি-তর্কে শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দিই, সতর্ক করি যে এই সমস্ত উইট, এক্সফরমেটিভ ভোল্টেজ থাকার পরও কাফকার গল্প কিন্তু আদতে কৌতুক নয়।

বরং ফাঁসিকাষ্ঠের শোকের মতো হিউমার, যা কাফকার বিভিন্ন ডায়েরি বা জার্নালে পাওয়া যায়, যেমন ‘আশা আছে, তবে আমাদের জন্যে নয়’—তা কাফকার গল্পভুবনের নয়। কাফকার গল্পে যা আছে তার নাম গ্রোটেস্ক, দুর্দান্ত, আধুনিক জটিলতা, এমন এক দ্ব্যর্থবোধকতা, যা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে বহু অর্থময় অবচেতন; অবশ্য অবচেতন শব্দটাকে আমার মনে হয় আত্মারই শৌখিন সাজগোজ করা চেহারা।

যাহোক, কাফকার হিউমার, ফলে, নিউরোটিক তো নয়ই, বরং বলা ভালো, অ্যান্টি-নিউরোটিক, একদম প্রকৃতিস্থ; ফলে ধর্মীয় হিউমার, তবে ধর্মীয় কির্কেগার্দিয়, রিল্কে বা হিব্রু বাইবেলের কবিতা বা প্রার্থনাসংগীতের অর্থে। এই হৃদয়বিদারক আধ্যাত্মিকতার কাছে মিস ও’কোনরের রক্তাক্ত নান্দনিকতাও খুব সহজ কিছু মনে হয়।

আমার ধারণা, এ কারণেই কাফকার উইট ছোটদের কাছে এত দুর্বোধ্য লাগে। কৌতুক মানে বিনোদন আর বিনোদন মানেই আশস্ত করা জিনিস—ছোটদেরকে আমাদের সংস্কৃতি এমনটাই শিখিয়েছে। কাফকার হিউমার শিক্ষার্থীরা বোঝে না এমন নয়, আমরাই তাদেরকে শিখিয়েছি, আত্মপরিচয়ের মতো হিউমার শুধু নিজের বুঝে নিতে হয়। ফলে তারা কাফকার মূল কৌতুকটা ধরতে না পারলে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না যে মানুষের আত্মচেতনা নির্মাণের ভয়াবহ সংগ্রামে এমন চৈতন্য নির্মিত হয়, যার মানবতা সে ভয়াবহ সংগ্রাম থেকে অবিচ্ছেদ্য। আমাদের অন্তহীন অসম্ভব বাড়ি ফেরাই আমাদের ঘর। আপনি এদের বলতে পারেন যে কাফকা না বোঝা খুব মন্দ কিছু নয়। আপনি এদের বলতে পারেন, কাফকার গল্পগুলোকে একধরনের দরজা ভাবতে, সেই দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়া, মাথা কুটতে থাকার কথা ভাবতে, মাথা কুটে আরও ক্রমশ রক্তাক্ত হওয়া, সেই ঘরে প্রবেশের আকাঙ্ক্ষা না, অতীব প্রয়োজন; এটা কী আমরা জানি না কিন্তু দরজায় ধাক্কা দিয়ে, মাথা কুটে মরে, প্রবেশের মরিয়াভাব আমরা অনুভব করি যে শেষ পর্যন্ত দরজাটা খুলে যায়…বাইরের দিকে খুলে যায়, যে দরজায় মরিয়া হয়ে ঢুকতে চাইছিলাম, আমরা আসলে এত দিন তার ভেতরেই ছিলাম। দাস ইশ কোমিশ (এটাই মজার)।

অন্য আলো অনলাইনে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

 



[ad_2]

Source link

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

amaderdinkal.com

ডেস্ক রিপোর্ট

%d bloggers like this: