অপেক্ষার প্রহরের শেষ কবে

করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ–বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ–বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: dp@prothomalo.com

 

‘মেঘের পর মেঘ জমেছে,
আঁধার করে আসে,
আমায় কেন বসিয়ে রাখ,
একা দ্বারের পাশে।’ (গীতাঞ্জলি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লাইনগুলোর মতো বর্তমানে পৃথিবীতে বিরাজ করছে করোনাভাইরাস নামক মহামারির এক ভয়াবহ অন্ধকার। যদিও আলোচ্য লাইনে ওই আঁধারের নেই তেমন ভয়াবহতা এবং যেই আঁধার উপেক্ষা করে বাইরে যাওয়ার কথা ভেবেছেন কবি, সেখানে বর্তমানে ঘরের বাইরে যাওয়াতেই রয়েছে যেন রোগটিকে ঘরে আমন্ত্রণ জানিয়ে আপ্যায়নের মতো সাদৃশ্যতা। ঘরের মধ্যে দিন কাটানোতেই রয়েছে যেন এই আঁধারকে জয় করার মূল মন্ত্রণা। তবে এই ঘরে বসে সময় কাটানো যে কতটা দীর্ঘায়িত হবে, কবে সেই অপেক্ষার প্রহর শেষে নতুন ভোরের সূর্যের রুপালি আভার দেখা মিলবে, তা হয়তো সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না। করোনাকে জয় করার ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে নতুন ভোরের সেই আলোকবর্তিকা নিয়ে হাজির হোক কোনো মহামানব, সেই প্রহরের প্রত্যাশায়।
করোনাভাইরাস মহামারিতে দেশ ও বিশ্ব যেখানে বিপর্যস্ত, সেখানে সামান্য কিছু সতর্কতা, সাবধানতা এবং পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতাই পারে করোনাভাইরাসের করাল গ্রাস হতে দেশ, জাতি ও বিশ্বকে রক্ষা করতে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কঠোর পরিশ্রম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখ থেকে বেঁচে ফিরেছেন অনেকে।
একজন সামরিক কৌশলবিদ পরাজয়ের কোনো শঙ্কা ছাড়াই শতসংখ্যক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আগে শত্রুকে ভালোভাবে জানার গুরুত্বের ওপর বেশি জোর দেন। কিন্তু শত্রু যেখানে করোনাভাইরাস, যার বিরুদ্ধে চলছে মানবজাতির কঠোর যুদ্ধ, সেই শত্রুই চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে একেবারে অজানা রহস্যের মতো, প্রতিনিয়ত যার নতুন নতুন লক্ষণ প্রকাশিত হচ্ছে এবং অচেতনভাবে মানুষকে আক্রান্ত করেই চলেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে করোনাভাইরাস এখনো যেন গোলকধাঁধার মতো, যেখানে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তদুপরি এই রোগটিতে আবার সাধারণত ফ্লুর মতোই লক্ষণগুলো থাকে, যা দ্বারা রোগটিকে চিহ্নিত করা আসলেই অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞান মারাত্মক এই রোগটি থেকে মুক্তি পেতে ভ্যাকসিন ও ওষুধ প্রস্তুত করার জন্য এখনো গবেষণা পরিচালনার পর্যায়ে রয়েছে।
করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন কবে নাগাদ আসতে পারে, তার নানান ডেডলাইন শোনা যাচ্ছে। তবে আক্রান্ত রোগীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য চিকিৎসকেরা রোগীদের লক্ষণগুলো অনুযায়ী সাপোর্টিং ট্রিটমেন্টগুলো দিয়ে সহায়তা করে থাকেন। করোনাভাইরাসের পাশাপাশি গৌণ সংক্রমণগুলো থেকে রোগীকে রক্ষা করতে তাঁরা কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোভিড-১৯–এ সংক্রমিত হওয়ার পরও যাঁরা বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে লক্ষণীয় চিকিত্সা শেষে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন, তার নেপথ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারা। বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়েই একই দৃশ্যপট।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস রোগীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যে ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে অসুস্থতা থেকে সেরে উঠেছেন। একই সঙ্গে বহুসংখ্যক ইতিমধ্যে হাসপাতালে চিকিত্সাধীনও।
যদিও মারাত্মক এই ভাইরাস থেকে মৃত্যুর হার বেশ উদ্বেগজনক, তবু আশার আলো এই যে ভাইরাসটি তার চার স্তরের ক্রিটিক্যাল পর্যায়টি অতিক্রম করার পর সক্রিয়তা দিন দিন হারিয়ে ফেলে। তবে স্বল্প পরিসরে হলেও যেভাবে সবকিছু খুলে দেওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে ভাইরাসটি কবে নাগাদ যে তার চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছাবে, তা যেন আকাশকুসুম কল্পনা হয়ে যাচ্ছে।
যাহোক, মহামারি এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যখন সবাই নেমেছি, তখন পেছনে ফিরে তাকানোর আর সুযোগ নেই; চিকিত্সাবিজ্ঞান শিগগিরই আমাদের জন্য উপায় খুঁজে বের করবে। আমাদের এখন যা প্রয়োজন তা হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হওয়ামাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হওয়া। তাহলে আমরা শিগগিরই করোনাভাইরাসকে পরাস্ত করতে পারব।
তবে মহামারির বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের মধ্যেও আমাদের শ্রমিকসমাজ এবং গরিব–দুঃখীদের ভুলে গেলে চলবে না। আধুনিক সভ্যতায় তাঁদের অবদানও কম নয়। চলমান লকডাউনে ও সাধারণ ছুটিতে কর্মহীন থাকার ফলে তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তাঁদের সাহায্যে সরকার ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। কারণ, তাঁদের হারালে দেশ তার অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলবে। পরিশেষে প্রিয় এক কবির কয়েকটি লাইন দিয়ে বলতে চাই—
‘হে পুরবাসী! হে মহাপ্রাণ,
যা কিছু আছে করগো দান,
অন্ধকারের হোক অবসান
করুণা-অরুণোদয়ে!’
মানুষ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসুক, জয় হোক মানবতার, জয় হোক মনুষ্যত্বের।

* শিক্ষার্থী, পুরকৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।makamamahmudchowdhury@gmail.com



[ad_2]

Source link

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

amaderdinkal.com

ডেস্ক রিপোর্ট

%d bloggers like this: